1. bnn.press@hotmail.co.uk : bhorersylhet24 : ভোরের সিলেট
  2. zakirhosan68@gmail.com : zakir hosan : zakir hosan
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের ভূমিকা - Bhorersylhet24

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের ভূমিকা

রিপোর্টার নাম
  • প্রকাশিত : রবিবার, ৭ মার্চ, ২০২১
  • ২৬২ বার ভিউ

ড. এ. এইচ. এম. মাহবুবুর রহমান : একটি সরকারের তিনটি বিভাগ থাকে। নির্বাহী বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং আইন বিভাগ। এই বিভাগগুলোর সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। আর গণমাধ্যম হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যেখানে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।গণমাধ্যম সরকারকে নানাভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতাও করে। একটি দেশের ও দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনন্য। আজকে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলছি আমরা, বলছি ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা। ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ এর কথা। যে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে উঠছে- তার রূপকার হলেন শেখ হাসিনা। তিনি যে রূপকল্প ঘোষণা করেছেন তার সবকিছুই বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না যদি সচেতন মানুষ এসকল কাজে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে অংশ না নিত। কাজেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যম- এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনটিই অবিচ্ছিন্ন প্রত্যয়। অবিচ্ছিন্ন মাধ্যম। যা সরকারকে পরিচালনা করার জন্য, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, জনগণের মূল্যবোধকে উন্নত করার জন্য, জনগণের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যে একযোগে কাজ করে।
আমেরিকাতে এইচ জ্যাকসন নামে একজন বিচারপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন আমেরিকার ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতি। এক সময় ভার্জিনিয়ার একটি বিদ্যালয়ের একটি ঘটনার বিচারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। তই সময় খৃষ্টান সম্প্রদায়ের একটি ছেলে ওই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করত। আমেরিকার নিয়ম অনুযায়ী সেখানে জাতীয় পতাকাকে সম্মান করতে হয়, স্যালুট জানাতে হয়। ওই সময় খৃষ্টান ছেলেটি পতাকাকে স্যালুট জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন ছেলেটির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়।
পরে মামলাটি উচ্চ আদালতে গড়ালে সেই বিচারের রায় দিতে হয় এই বিচারপতিকে। দেখা গেল, ওই ছেলেটির পক্ষেই আদালত রায় দিলেন। বিচারক ছেলেটির মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। জন্মগত অধিকারের প্রশ্নে সে অটল থেকেছে। ছেলেটির সম্প্রদায়ের লোকেরা কোনোকিছুকেই স্যালুট করেন না।
বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন, আমেরিকার জাতীয় সংবিধানে প্রথম সংশোধনী ছিল, মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে। ষাটের দশকে ভারতে প্যাট শার্প নামে একজন নারী লেখক ছিলেন। তিনি পত্রিকায় কলাম লিখতেন। কলাম লিখতে গিয়ে তিনি একবার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘মীরজাফর’ বলে উল্লেখ করলেন। অথচ সুভাষচন্দ্র বসুকে জাতীয় নেতা হিসেবে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামী হিসেবে সম্মান করা হয় ভারতে। মহাত্মা গান্ধীর চাইতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। তিনি ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার কৌশল হিসেবে জাপানে গিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
এ কারণে সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতে জাতীয় বীর বলা হয়। আর মহাত্মা গান্ধী নানানভাবে ব্রিটিশদের সঙ্গে আপোষ করলেও এর ব্যতিক্রম ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। মহাত্মা গান্ধী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে যেতেন না। যখন দেখতেন সহিংসা হচ্ছে, যখন দেখছেন মারামারি হচ্ছে, তিনি আন্দোলন স্থগিত করে দিতেন। নেতাজীর মতো জাতীয় বীরকে নিয়ে লেখক তার কলামে এমন মন্তব্য লিখলেন সুভাষচন্দ্র বসু জাপানে আশ্রয় নেওয়ার কারণে।
প্যাট শার্প লিখলেন, সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে শত কোটি মানুষ যে তাকে সম্মান করে, এটি অন্যায়। সুভাষচন্দ্র বসুর বড় ভাই ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। তার ছেলে শিশির বসু। তিনি মানহানির মামলা করলেন। সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে এরূপ অপবাদ দেওয়ায় কলকাতার কোর্টে মানহানির মামলা দায়ের হলো। বিচারে সাংবাদিকের কারাদণ্ড হলে তিনি আপিল করলেন সুপ্রিম কোর্টে।
পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিলে বিচারপতি বললেন, সাংবাদিকের অধিকার রয়েছে লেখার। এটি লিখে তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে অপমানিত করেন নাই বরং সাংবাদিক হিসেবে নিজেই অপমানিত হয়েছেন। এমন কথা তার লেখা ঠিক হয়নি, কিন্তু তার লেখার অধিকার রয়েছে।
প্রতিটি মানুষের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তবে আমি কি লিখছি সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। যারা গণমাধ্যমে লেখেন, গণমাধ্যমে কাজ করেন, তারা জানেন, গণমাধ্যমের তিনটি নীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত সাংবাদিকদের সৎ হতে হয়। দ্বিতীয়ত লেখায় থাকতে হয় সঠিক তথ্য বা একুইরেসি এবং তৃতীয় ফেয়ারনেস বা বস্তুনিষ্ঠতা।
অনেকেই জানেন, ১৯৯২ সালে পত্রিকার একটা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ভারতে বাবরি মসজিদকে রাম মন্দিরে রূপান্তর করা হলো। ২০১২ সালে একটি মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে কুরআন শরীফ অবমাননার অসত্য অভিযোগ তুলে রামু-উখিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হলো। প্রার্থনালয়ে আগুন দেওয়া হলো। খুলনার সাংবাদিক মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালুকে নিজ কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হলে শুধুমাত্র বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করার দায়ে। তারা মিথ্যার আশ্রয় নেননি। সততা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়বদ্ধতার ভেতরে প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। আমি যেন সংবাদটা শেষ না করে পত্রিকা ছাড়তে না পারি সেটিই হলো আনন্দের ও সৌন্দর্যের বিষয়। ঠিক গল্প ও কবিতার মতো।
এ জন্যেই সাংবাদিককে গল্পকার বলি আমরা। কবি বলি, লেখক বলি। সাংবাদিককে আমরা স্টোরি মেকার, স্টোরি টেলার বলি। কেন? সাংবাদিক চমকপ্রদ করে সংবাদ উপস্থাপন করেন। সুন্দর একটি শিরোনাম দেন। শিরোনাম দেখেই অনেককিছু আন্দাজ করি। আবার সবটুকু যেন বুঝতেও পারি না। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মতো। একজন সাংবাদিক হলেন মনস্তাত্ত্বিকও। তিনি জানেন কোন সংবাদের শিরোনাম কেমন হলে মানুষের মিথস্ক্রিয়া কেমন হবে।
এ দিকে, গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। নির্বাহী বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মতো আরেকটি বিভাগ হচ্ছে গণমাধ্যম। যারা এখানে কাজ করেন তাদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত জনসভায় বোমা হামলা, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা, ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার সচিত্র প্রতিবেদনগুলো মানুষের কাছে দায়িত্ব নিয়েই পৌঁছে দিয়েছিল গণমাধ্যম।
আর উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যেই সংবাদকে বলা হয় ওয়ান টু মেনি। মানে একজন অনেকজনের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে। একটি সংবাদ অনেক মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একটি সুন্দর খবর সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড়, আধাসের পানি দিয়ে স্যালাইন বানালে ডায়রিয়া ভালো হয়ে যায়। আগে কলেরায় গ্রামের পর গ্রামের মানুষ মারা যেত। মানুষ জানত না খাবার স্যালাইন বানানোর উপায়। আর্সেনিক ও ঘা-সহ এসব রোগ ভালো হয় না ভেবে মানুষ স্বজনদের থেকে দূরে থাকত। সাংবাদিকরাই তাদের প্রতিবেদনে এসব লিখে লিখে জনসচেতনতা বাড়িয়েছেন।
১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় এ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। ওই সময়েও সাংবাদিকরাই মানুষকে সংবাদ পরিবেশন করে সমাজে নানা পরিবর্তনের অনুঘটক হন।একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি, আমরা ক্লাসে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করি। সাংবাদিকরা শত-সহস্র জনের কাছে সংবাদ পৌঁছান। মহানগর, জেলা বা মফস্বল- পত্রিকা যেখান থেকেই বের হোক না কেন তার আলাদা গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে। কারণ এটি একটি মাধ্যম। এই মাধ্যম থেকে সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তা পৌঁছে যায়।
গণমাধ্যমকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে এও মনে রাখতে হবে যে, আপনি যখন একটি সংবাদ পরিবেশন করবেন সেই সংবাদটি যাতে তথ্যবহুল হয়, নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকে, গ্রহণযোগ্যতায় ঘাটতি না হয়- সে সবও খেয়াল রাখা জরুরি।
এক সময় বিটিভি ছাড়া বাংলাদেশে কোনো টেলিভিশন ছিল না। আর ছিল রেডিও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে এটির নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বেতার। এখন বাংলাদেশে ৩৬টিরও বেশি বেসরকারি টেলিভিশন রয়েছে। পাশাপাশি এখন গণমাধ্যমের পরিধিও অনেক বড় হয়েছে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রত্যেকটি গ্রাম হবে শহর। এটি শেখ হাসিনার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বরের প্রতিধ্বনি। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে। সুখী-সমৃদ্ধ শক্তিশালী বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর ভিশন। এখন প্রায় প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। এর পেছনে মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার তাগিদবোধ রয়েছে। মানুষের দুটি হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মানুষের মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে। সেই কাজটিই করছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক: চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

খোলা চিঠি বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব.

নিউজ শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *